কিভাবে নামাজের মাধূর্য আস্বাদন করা যায়? পর্ব ৯

বিশ্বাসের মাধুর্যঃ

একটি প্রশ্ন: মনে করুন আপনি একজন অপরাধী, এবং আপনার অসংখ্য অপরাধের জন্য একজন বাদশাহ আপনাকে ৫০ বছরের কারাদন্ড দেবে। এবং আপনাকে বলা হল সেই ৫০ বছরের কারা ভোগের পর তিনি আপনাকে একটা প্রশ্ন করবেন। আপনি যদি সঠিক উত্তর দিতে পারেন, আপনাকে মুক্তি দেওয়া হবে। যদি সঠিক উত্তর দিতে না পারেন আপনাকে মৃত্যু দণ্ড দেওয়া হবে। আপনাকে যখন সেই কারাগারে নেওয়া হবে, ৫০ বছর আপনি কি নিয়ে চিন্তা করবেন? আপনি কি এটা ছাড়া আর কিছু নিয়ে ভাবতে পারবেন যে – কি হতে পারে সেই প্রশ্ন?

এখন আরও একটু কল্পনা করুন যে, সেই কারাগারে আপনার সাথে আরও একজন বন্দি আছে যে বলল, আমি জানি বাদশাহ তোমাকে ঠিক কি প্রশ্নটি করবেন। আপনার তখন কেমন বোধ হবে? আপনি সেই প্রশ্নটি জানার জন্য আকুল হয়ে যাবেন। এবং জানার সাথে সাথে সঠিক উত্তরটি দেওয়ার জন্য যথা সাধ্য প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করবেন।

বাস্তবে আমরা প্রত্যেকেই সেই কারাবন্দি মানুষ। কেয়ামত দিবসে সেই একটি বিশেষ প্রশ্ন আমাদের করা হবে, যার উত্তর আমরা যদি ঠিক মত দিতে পারি, তবে ইনশাল্লাহ আশা করা যায়, পরবর্তী সব কিছু সহজ হবে। আর যদি না দিতে পারি তবে তার পরিনতি ভয়াবহ। আজকে এখানে সেই প্রশ্নটি নিয়েই আলোচনা করা হবে যেটি জানার জন্য আমরা সবাই অধীর হয়ে আছি। এটি আমার কথা নয়, এটি আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) এর কথা –

أول ما يحاسب به العبد يوم القيامة هي الصلاة. فإن صلحت، صلح سائر عمله. وإن فسدت، فسد سائر عمله

আল্লাহর বান্দার কাছ থেকে কিয়ামাত দিবসে যে বিষয়টির হিসাব সবার প্রথমে নেওয়া হবে তা হল নামাজ। এই হিসাব যদি সন্তোষজনক হয় তাহলে তার পরবর্তী কাজ গুলো সহজ হবে। আর যদি তা অসন্তোষজনক হয় তাহলে তার পরবর্তী হিসাব হবে কঠিন।(তিরমিজী, বায়হাকি, নাসায়ী)

আমরা হব পরবর্তীতে উল্লেখিত পাঁচ ধরনের মধ্যে যে কোন এক ধরনের ব্যক্তি যে এই প্রশ্নের সম্মুখীন হব। আমরা তাহলে কোন ধরনের হতে চাই?

মসজিদে খুশু নিয়ে নামাজ আদায়কারী

প্রথম ধরনের ব্যক্তি হবে সেই ব্যক্তি যে মযজিদে যায় এবং খুশু সহকারে জামাতে নামাজ আদায় করে অথবা সেই মহিলা যে আজান শেষ হওয়ার পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নামায আদায়ের জন্য খুশু নিয়ে দাঁড়ায়। এটি হল সর্বোত্তম অবস্থা এবং আপনি যদি এই অবস্থায় ইতিমধ্যে থেকে থাকেন তাহলে তা দৃঢ়তার সাথে আঁকড়ে রাখুন। আল্লাহ বলেন –

الذين هم على صلاتهم يحافظون أُولائِكَ فِى جَنَّٰاتٍ مُّكْرَمُونَ

এবং সর্বোপরি যারা নিজেদের নামায হেফাজত করে, পরকালে এরাই আল্লাহর জান্নাতে মর্যাদা সহকারে প্রবেশ করবে। (সুরা আল মারিজ ৩৪-৩৫)

আল্লাহ এদের ব্যাপারে আরও বলেন-
أولائك هم الوارثون الذين يرثون الفردوس هم فيها خالدون

এ লোকগুলোই হচ্ছে মুলত জমিনে আমার যথার্থ উত্তরাধিকারী, জান্নাতুল ফিরদাউসের উত্তরাধিকারও এরা পাবে, এরা সেখানে চিরকাল থাকবে। (সুরা আল মুমিনুন ১০-১১)

ফিরদাউস হল জান্নাতের সর্বউচ্চ স্তর।

মসজিদে নামায আদায়কারী কিন্তু খুশুর অভাব

এই ধরনের ব্যক্তি মসজিদে গিয়ে নামায আদায় করার জন্য পুরস্কৃত হবে। মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) বলেন-
صلاة الجماعة أفضل من صلاة الفرد بسبع وعشرين درجة

জামাতে নামায আদায়কারী একা নামায আদায়কারির চেয়ে ২৭ গুন বেশি সওয়াব পাবে।

তারপরও, খুশু না থাকা কোন হেলাফেলার বিষয় না। উমর (রাঃ) একদিন মসজিদের মিম্বরে দাড়িয়ে বলেন –

এমনও আছে কোন লোক ইসলামের পথে চলতে চলতে বৃদ্ধ হয়ে গেল অথচ সে একটি নামাজের জন্য ও পুরস্কৃত হলনা।
তখন তাকে কারণ জিজ্ঞাসা করা হল।
তিনি উত্তরে বললেন – খুশুর অভাবে।

নামাজে পরিপূর্ণ খুশুর একটি উদাহরন দেখুন। একদিন সকালে আল কাসিম বিন মুহাম্মাদ (রাঃ) আয়েশা (রাঃ) এর কাছে গেলেন। তিনি তাকে নামাজে একটি আয়াত পরতে দেখেলন –
فمن الله علينا ووقانا عذاب السموم

‘আর এ কারনেই আজ আল্লাহ তায়ালা আমাদের উপর এ সব নেয়ামত দিয়ে অনুগ্রহ করেছেন, সর্বোপরি তিনি আমাদের জাহান্নামের গরম আগুনের শাস্তি থেকেও রক্ষা করেছেন।’ (সুরা আত তূরঃ২৭)

উনি যখন এই

আয়াতটি পড়ছিলেন, উনি কাঁদছিলেন এবং উনি আবার এই আয়াতটি পড়ছিলেন। এরকম তিনি এতবার করছিলেন যে আল কাসিম (রাঃ) বিরক্ত হয়ে বাজারে উনার দরকারি জিনিস কিনতে চলে গেলেন। সে যখন ফিরে আসলেন, দেখলেন আয়েশা (রাঃ) একই জায়গায় দাড়িয়ে তখনও সেই একই আয়াত পড়ছেন আর কাঁদছেন।

মুসলিম বিন ইয়াসার ও নামাজের নিষ্ঠার এমন আরেকটি উদাহরন। একদিন মসজিদের একটি অংশ ভেঙ্গে পড়ে গেল। লোকজন দৌড়ে সেখানে ছুটে আসলো কারন তারা জানত উনি এখানে নামায পড়ছিলেন। উনাকে সেখানে তখনও একভাবে নামাজে মগ্ন অবস্থায় দাড়িয়ে থাকতে পাওয়া গেল।

ঘরে নামায আদায়কারী

ঘরে নামায পড়া আর মসজিদে নামায পড়ার তফাত কি? প্রথমে আমাদের জানতে হবে মসজিদে নামায পড়ার বৈশিষ্ট কি। মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) বলেন-

إذا أمن الإمام فأمنوا، فإنه من وافق تأمينه تأمين الملائكة غفر له ما تقدم من ذنبه

যখন ইমাম নামাজে আমীন বলেন, তোমরাও একই সাথে আমীন বলবে। যদি এটি ফেরেশতাদের আমীন বলার সাথে মিলে যায় তবে তোমাদের পূর্বের সমস্ত গুনাহ মাফ হয়ে যাবে (বুখারি)।

সাইয়িদ আল মুসায়িব বলেন- ৪০ বছরে এমন কখনও হয়নি, মুয়াজ্জিন আজান দিয়েছে অথচ আমি মসজিদে উপস্থিত ছিলাম না।

আরেকটি চমৎকার ঘটনার উল্লেখ করছি। উবায়দাল্লাহ বিন উমার আল কাওারিরি বলেন-

আমি কখনও মসজিদের ঈশার জামাত ছাড়তাম না। একদিন, আমার কাছে এক মেহমান আসলে তার সাথে কথায় কথায় সময় কেটে যায়। হটাৎ খেয়াল হল ঈশার জামাতের সময় তো চলে গেল। আমি বসরার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ঘুরে এমন মসজিদ খুজতে লাগলাম যেখানে তখনও জামাত শুরু হয়ে যায়নি। কিন্তু এমন একটি মসজিদ ও পেলাম না। রাসুল (সাঃ) এর সেই কথাটি ভাবতে ভাবতে ঘরে ফিরলাম যে উনি বলেছেন একাকি নামাজের চেয়ে জামাতে নামায ২৭ গুন উত্তম। তখন আমি ঘরে ২৭ বার নামায পরলাম। ওই রাতে আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমি ঘোড়ার পিঠে একদল লোকের সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করছি কিন্তু কিছুতেই তাদের ধরতে পারছিনা। তখন তাদের একজন বলল, তুমি কিছুতেই আমাদের ছাড়িয়ে যেতে পারবে না। যখন আমি জিজ্ঞেশ করলাম -কেন, সে বলল কারন আমরা একত্রে নামজ পড়েছি, তুমি পড়নি। আমি অত্যন্ত কষ্ট নিয়ে ঘুম থেকে উঠলাম।

দেরীতে নামায আদায়কারী

আমরা যদি জানি যে আমাদের বিকাল ৪ টায় ফ্লাইট আছে, আমরা কি ৫ টায় পৌঁছব? না, কারন এখানে অনেক কিছু জড়িত, আমরা টাকা খরচ করে টিকেট কিনেছি, কেউ হয়ত আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে, অথবা আমাদের ছুটি দরকার। এই সমস্ত কিছুর চেয়েও নামায অনেক বেশি জরুরি। তাহলে আমরা কিভাবে ফজরের নামায কাজা করতে পারি আর তা বেলা ১০ টায় আদায় করতে পারি? অথবা জোহর ও আসর একত্রে পড়তে পারি? অথবা মাগরিব নামায পড়তে ঈশার আজান পর্যন্ত দেরি করতে পারি?

আহমেদ বর্ণিত হাদিসে আছে,

من حافظ عليها كانت له نورًا وبرهانًا ونجاة يوم القيامة ومن لم يحافظ عليها لم تكن له نورًا ولا برهانًا ولا نجاة وكان يوم القيامة مع قارون وفرعون وهامان وأُبيَّ بن خلف

যে সবসময় সময় মত নামায আদায় করা চালিয়ে যায়, কিয়ামাতের দিন এই নামায তার জন্য হয়ে যাবে নুর, সাক্ষী এবং গুনাহ মাফের কারন। নতুবা তাকে দাড় করান হবে ফারাও, কারুন, হামান আর উবাই ইবনে খালাল এর সাথে।

যে নামায আদায় করে না

নামায পড়তে কতক্ষণ সময় প্রয়োজন? ৫ মিনিট? অথবা খুশু নিয়ে পড়লে ১০ মিনিট? তারপরও সারাদিনের আল্লার জন্য এই মাত্র ৫০ মিনিট আমাদের কাছে অনেক বেশী মনে হয়। এই হাদিসটি শুনুন-

بين الرجل وبين الكفر ترك الصلاة

একজন মানুষ ও একজন কাফিরের মধ্যে পার্থক্য কারী জিনিস হল নামায। (মুসলিম, বুই-১, হাদিস-১৪৭ )

নিজেকে জিজ্ঞেস করুন আপনি কোন প্রকারের মানুষের দলে পড়ছেন? আল্লাহ আমাদের সবাই কে যেন সেই প্রথম দলের অন্তর্ভুক্ত করেন। আমীন।

চলবে……

****

Categories: সালাহ/নামায | মন্তব্য দিন

পোস্টের নেভিগেশন

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

Blog at WordPress.com.

%d bloggers like this: