অনুরাগ ও আত্মোৎসর্গ

হযরত আবু বকর (রা) এর ইসলাম গ্রহণের পর মক্কায় একবার তাঁর উপর শত্রুরা আক্রমণ করে বসে। ওৎবা ইবন রবী’আ তাঁকে নির্দয়ভাবে প্রহার করেছিল। ফলে তাঁর চেহারা এমনভাবে ফুলে গিয়েছিল,তাঁকে দেখে চেনাই মুশকিল হয়ে গিয়েছিল। বনু তামীম তাঁকে কাপড়ে জড়িয়ে তাঁর ঘরে পৌঁছে দিয়েছিল। তিনি যে তাতে নির্ঘাত মারা যাবেন তাতে কারো কোন সন্দেহ ছিল না। বেলা ডোবার পর তিনি জ্ঞান ফিরে পান। তারপর তিনি প্রথমেই জিজ্ঞেস করেন, ‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খবর কি ? তিনি কেমন আছেন?’ লোকে তাঁর একথা শুনতেই ক্রোধান্বিত হয়, এই অবস্থাতেও তিনি তাঁরই কথা স্মরণ

করছেন যাঁর কারণে আজ তাঁর এই করুণ হাল! এজন্যে তারা তাঁকে কটুকাটব্য ও ভর্ৎসনা করতে লাগল। তারা হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু এর মা উম্মুল খায়রকে ডেকে বলল, ‘দেখুন! তাঁর কিছু খানাপিনার ব্যবস্থা করুন’। মা তাকে খাবার গ্রহণের জন্যে অনেক পীড়াপীড়ি করলেন। কিন্তু তাঁর মুখে সেই একই কথা, ‘বল ! আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেমন আছেন? উত্তরে তিনি বললেন, ‘আল্লাহর কসম! আমি তোমার সাথী সম্পর্কে কিছুই জানি না’।

তখন তিনি তাঁর মাকে বললেন, আপনি খাত্তাব কন্যা উম্মু জামিলের কাছে যান এবং তাঁর কুশল জেনে এসে আমাকে জানান। তিনি উম্মু জামীলের নিকট গিয়ে বললেন, আবু বকর মুহাম্মদ ইবন আব্দুল্লাহর কুশল জানতে চাচ্ছে। উম্মু জামীল বললেন, আমি আবু বকরকেও চিনি না আর মুহাম্মদ ইবন আব্দুল্লাহকেও জানি না। আপনারা যদি চান বরং আপনার সাথে গিয়ে আপনার ছেলেকে এক নজর দেখে আসতে পারি। তিনি সম্মতি জানিয়ে বললেন, ঠিক আছে, চলুন।

এরপর উভয়ে একত্রে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু এর নিকটে এসে তাঁকে ঐ অবস্থায় দেখতে পেলেন। উম্মু জামীল আবু বকর(রা) এর একেবারে কাছাকাছি গিয়ে তাঁর শারীরিক অবস্থা দেখলেন এবং বললেন, ‘আল্লাহর কসম! যে সম্প্রদায় আপনার সাথে এরূপ (নিষ্ঠুর ও নির্দয়) আচরণ করেছে তারা দুরাচার ও কাফির। আমি আশা করি আল্লাহ তাদের থেকে আপনার প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন। হযরত আবু বকর(রা) তাকে বললেন, ‘আগে বলুন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অবস্থা কেমন? তিনি কেমন আছেন’? উম্মু জামীল বললেন, ‘আপনার মা তো শুনতে পাচ্ছেন’। তিনি বললেন, ‘তাঁর পক্ষ থেকে ভয় পাবার কিছু নেই। আপনি স্বচ্ছন্দে বলতে পারেন’। উম্মু জামীল তখন বললেন, ‘তিনি সুস্থ আছেন এবং ভালো আছেন’।

তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তিনি এখন কোথায়? বললেন, তিনি এখন আরকামের বাড়িতে অবস্থান করছেন। আবু বকর (রা) বললেন, আল্লাহর কসম ! এখন আমি আর পানাহার করতে পারি না যতক্ষণ না আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর খেদমতে গিয়ে হাজির হই। এরপর তাঁরা উভয়ে কিছুটা অপেক্ষা করলেন। রাত হলো এবং মানুষের চলাফেরা এবং আনাগোনা যখন কমে গেলো তখন উম্মু জামীল আবু বকর (রা) কে নিয়ে আরকামের বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লেন এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে গিয়ে হাজির হলেন। তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখা মাত্রই যেন জীবন ফিরে পেলেন । এরপর তিনি পানাহার করলেন। (১)

জনৈক আনসারী মহিলা, যাঁর বাপ,ভাই,স্বামী ওহুদ যুদ্ধে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে যুদ্ধ করতে গিয়ে শাহাদাত লাভ করেছিলেন, নিজ আবাস থেকে বেরিয়ে লোকদের জিজ্ঞেস করতে লাগলেন; রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খবর কি? তিনি কেমন আছেন? লোকেরা জওয়াবে বলল, আলহামদুলিল্লাহ! তিনি ভালো আছেন,সুস্থ আছেন ,যেমনটি তুমি চাও। মহিলাটি বলল, আমাকে দেখাও।আমি হুজুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখতে চাই। এরপর মহিলা হুজুর আকরাম রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখা মাত্রই আবেগাপ্লুত কন্ঠে বলে উঠলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ ! আপনাকে দেখার পর আর সব বিপদ-আপদই তুচ্ছ।(২)

হযরত খুবায়ব রাদিয়াল্লাহু আনহুকে শূলে চড়ানো হয়। শূলে চড়াবার পূর্বে কাফিররা তার ঈমানের পরীক্ষা নেবার জন্যে বলেছিল, আমরা তোমাকে মুক্তি দিতে পারি যদি তুমি এতে রাজি থাক, আমরা তোমাকে মুক্তি দেই আর তোমার স্থলে মুহাম্মদ(সা) কে ফাঁসি দেই। একথা শুনতেই তিনি বলে উঠলেন, আল্লাহর কসম! আমি তো এও পছন্দ করি না, তাঁর পায়ে একটা কাঁটা বিধুক আর আমি তার বিনিময়ে মুক্তি পাই। খুবায়ব রাদিয়াল্লাহু আনহু এর কথায় তারা সকলেই হেসে উঠে।(৩)

হযরত যায়িদ ইবন সাবিত রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ওহুদ যুদ্ধের দিন আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে সাদ ইবনুর রবী’র সন্ধানে পাঠালেন এবং বললেন, যদি তুমি তাকে পাও তবে তাকে আমার সালাম বলবে এবং বলবে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানতে চেয়েছেন তুমি এখন কেমন বোধ করছ। যায়দ (রা) বললেন, আমি নিহতদের মধ্যে ঘুরতে লাগলাম। এরপর তাঁকে পেতেই গিয়ে দেখলাম, তাঁর অন্তিম মুহুর্ত সমাগত। তাঁর শরীরে তীর, তলোয়ার ও বল্লমের সত্তরটির মতো আঘাত। আমি তাঁকে বললাম, সা’দ ! আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপনাকে সালাম পাঠিয়েছেন এবং জানতে চেয়েছেন, আপনার অবস্থা এখন কেমন? আপনি কেমন বোধ করছেন? উত্তরে তিনি বললেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আমার সালাম বলবে এবং আরও বলবে, ইয়া রাসুলুল্লাহ ! আমি জান্নাতের খোশবু পাচ্ছি। আর আমার সম্প্রদায় আনসারদের বলবে, যদি তোমাদের অনাবধানতায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কিছু হয়ে যায়, এমতাবস্থায় যদি তোমাদের একটি চোখও অক্ষত থাকে তাহলে আল্লাহর দরবারে তোমাদের কোন ওজর থাকবে না। এর পরক্ষণেই তাঁর প্রাণ বেরিয়ে যায়। (৪)

ওহুদ যুদ্ধের দিন সাহাবী হযরত আবু দুজানা রাদিয়াল্লাহু আনহু কাফিরদের নিক্ষিপ্ত তীর-তলোয়ারের হাত থেকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বাঁচাতে গিয়ে আপন পৃষ্ঠদেশকে ঢালের ন্যায় পেতে দিয়েছিলেন। নিক্ষিপ্ত তীরগুলো তাঁর পিঠে এসে লাগত আর তিনি এক চুলও নড়াচড়া করতেন না।(৫) মালিক আল-খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ক্ষতস্থান থেকে গড়িয়ে পড়া রক্ত চুষে খেয়ে পরিষ্কার করে দিয়েছিলেন। যায়দ(রা) তাঁকে থুতু ফেলতে বলেন। কিন্তু তিনি তাতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেছিলেন, আল্লাহর কসম ! আমি কখনোই থুতু ফেলব না। (৬)

আবু সুফিয়ান যখন মদীনায় এসেছিলেন, তখন তিনি তাঁর নিজ কন্যা উম্মুল মুমীনিন হযরত উম্মু হাবীবা(রা) এর ঘরে গিয়ে উঠেন এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিছানায় বসতে উদ্যত হন। উম্মু হাবীবা রাদিয়াল্লাহু আনহা তৎক্ষণাৎ বিছানা উল্টিয়ে দেন। বিস্মিত আবু সুফিয়ান কন্যাকে বললেন, বেটি ! আমি জানি না, তুমি কি আমাকে এই বিছানার উপযুক্ত মনে করনি নাকি এই বিছানাই আমার উপযুক্ত নয় বলে মনে করেছ। উম্মু হাবীবা(রা) বলেন, না, তা নয়, বরং এ বিছানা স্বয়ং আল্লাহর রাসূলের আর আপনি মুশরিক বিধায় অপবিত্র।(অতএব, আপনি এ বিছানায় বসার উপযুক্ত নন)।(৭)

ওরওয়া ইবন মাসউদ ছাকাফী হুদায়বিয়া থেকে প্রত্যাবর্তনের পর আপন সঙ্গী-সাথীদের বলেছিলেন, লোক সকল ! আল্লাহর কসম করে বলছি, আমি রাজা-বাদশাহদের দরবারে গিয়েছি। পারস্য সম্রাট কিসরা, রোম সম্রাট কায়সার ও আবিসিনিয়ার অধিপতি সম্রাট নাজাশীর দরবারেও গিয়েছি, দেখেছি। আল্লাহর কসম ! মুহাম্মদের (সা) সাথীরা মুহাম্মদকে(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যতটা সম্মান ও সমীহ করে, ততটা সম্মান ও সমীহ কোন রাজা বাদশাহর সাথীদেরকে তাদের রাজা বাদশাহদেরকে করতে দেখিনি। আল্লাহর কসম করে বলছি, যখন তিনি থুতু ফেলেন তখন তা তাদেরই কারো হাতের উপর গিয়ে পড়ে। আর অমনি তাঁরা তা তাঁদের মুখমণ্ডল ও শরীরে মেখে নেয়। যখন তিনি কোন কাজের নির্দেশ দেন অমনি সকলে সেই নির্দেশ পালনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আর তিনি যখন ওযু করেন তখন সেই গড়িয়ে পড়া পানি সংগ্রহের জন্যে কাড়াকাড়ি শুরু হয়ে যায়। তিনি যখন কথা বলেন, তখন তারা নিজেদের স্বর নিচু করে দেয় এবং অতিরিক্ত শ্রদ্ধাবশত তারা কখনোই তাঁর চেহারার দিকে গভীর ও পরিপূর্ণ দৃষ্টি নিয়ে তাকায় না। (৮)

___________________________________________

(১) আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইবন কাসীর কৃত, ২য় খণ্ড, ৩০ পৃ

(২)ইবন ইসহাক ও বায়হাকী

(৩)আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪খ, ৬৩ পৃ

(৪)যাদুল মা’আদ, ২খ, ১৩৪

(৫)যাদুল মা’আদ,১৩০ পৃ

(৬)যাদুল মা’আদ, ২য় খ, ১৩৬ পৃ

(৭) সীরাত ইবন হিশাম

(৮) যাদুল মা’আদ, ২খ, ১২৫ পৃ

মূলঃ মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কি হারালো – সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী(র)

*****

Categories: ইতিহাস | মন্তব্য দিন

পোস্টের নেভিগেশন

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

Blog at WordPress.com.

%d bloggers like this: